Soiad Mahedi Logo

হযরত নূহ (আ.)-এর জীবনী, মহাপ্লাবন এবং অন্যান্য ধর্মে তাঁর ইতিহাস

Islamic History 10 Mar, 2026 123 views
হযরত নূহ (আ.)-এর জীবনী, মহাপ্লাবন এবং অন্যান্য ধর্মে তাঁর ইতিহাস

মানবজাতির ইতিহাসে হযরত নূহ (আ.) এক অবিস্মরণীয় নাম। তাঁকে বলা হয় মানবজাতির 'দ্বিতীয় পিতা' (আবুশ বাশার ছানি)। পৃথিবীতে যখন সর্বপ্রথম শিরক বা মূর্তিপূজার সূচনা হয়, তখন মহান আল্লাহ তাঁকে প্রথম 'রাসূল' হিসেবে প্রেরণ করেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো 'ঐতিহাসিক মহাপ্লাবন' বা 'Great Flood' এবং তাঁর তৈরি বিশাল নৌকা (Ark of Noah)।

মজার বিষয় হলো, হযরত নূহ (আ.) এবং এক ভয়াবহ মহাপ্লাবনের এই ঘটনা শুধু ইসলামেই নয়, বরং পৃথিবীর প্রায় সব বড় ধর্ম এবং প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাসে ভিন্ন ভিন্ন নামে বর্ণিত হয়েছে। আসুন, ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের আলোকে নূহ (আ.)-এর বিস্তারিত ইতিহাস জেনে নিই।

নূহ নবীর নৌকা - প্রতীকী ছবি (ক্যাপশন: হযরত নূহ (আ.)-এর কিস্তি বা নৌকার একটি কাল্পনিক চিত্র)


🌙 ইসলামের দৃষ্টিতে হযরত নূহ (আ.)-এর ইতিহাস

ইসলাম ধর্মে হযরত নূহ (আ.)-কে অত্যন্ত সম্মানজনক স্থান দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে তাঁর নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা (সূরা নূহ) রয়েছে এবং কুরআনের মোট ৪৩টি স্থানে তাঁর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

১. মূর্তিপূজার সূচনা ও নূহ (আ.)-এর আগমন

হযরত আদম (আ.)-এর কয়েক প্রজন্ম পর মানুষের মাঝে প্রথম মূর্তিপূজা শুরু হয়। ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনা মতে, ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুছ, ইয়াউক ও নাসর—এরা ছিলেন তৎকালীন সমাজের পাঁচজন পুণ্যবান মানুষ। তাঁদের মৃত্যুর পর শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ তাঁদের মূর্তি বানিয়ে পূজা শুরু করে। এই ঘোর অন্ধকারে আল্লাহ নূহ (আ.)-কে নবী হিসেবে পাঠান।

২. ৯৫০ বছরের সুদীর্ঘ দাওয়াত

হযরত নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকতে শুরু করেন। তিনি দিনে-রাতে, গোপনে ও প্রকাশ্যে তাদের বুঝিয়েছেন। কিন্তু তাঁর কওমের লোকেরা চরম অবাধ্য ছিল। তারা কানে আঙুল দিয়ে রাখত এবং কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে নিতো যাতে নূহ (আ.)-এর কথা শুনতে না হয়। পবিত্র কুরআন অনুযায়ী, তিনি তাঁর জাতির মাঝে ৯৫০ বছর অবস্থান করেন এবং দ্বীনের দাওয়াত দেন। এত দীর্ঘ সময়ে মাত্র ৮০ জনের মতো (মতান্তরে সামান্য বেশি) নারী-পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

৩. নৌযান (কিস্তি) তৈরির নির্দেশ

قوم-এর চরম অবাধ্যতায় হতাশ হয়ে আল্লাহর নির্দেশে নূহ (আ.) বদদোয়া করেন, "হে আমার রব! পৃথিবীতে কোনো কাফিরকে বসবাসকারী হিসেবে ছেড়ে দেবেন না।" (সূরা নূহ: ২৬)। এরপর আল্লাহ তাঁকে একটি বিশাল নৌকা তৈরির নির্দেশ দেন। যখন তিনি নৌকা বানাচ্ছিলেন, তখন তাঁর জাতির লোকেরা তাঁকে নিয়ে চরম উপহাস ও ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত।

৪. মহাপ্লাবন ও ছেলের মর্মান্তিক পরিণতি

অবশেষে আল্লাহর আজাব নেমে আসে। জমিনের নিচ থেকে পানি উথলে ওঠে এবং আকাশ থেকে প্রবল মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। আল্লাহ নূহ (আ.)-কে নির্দেশ দেন প্রত্যেক প্রাণী ও পশুপাখির এক এক জোড়া এবং ঈমানদারদের নৌকায় তুলে নিতে।

এই প্লাবনের সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্য ছিল নূহ (আ.)-এর নিজের ছেলে 'কানআন' (মতান্তরে ইয়াম)-এর পরিণতি। সে ঈমান আনেনি। নূহ (আ.) তাকে নৌকায় ওঠার জন্য ডাকলে সে বলে, "আমি কোনো পাহাড়ে আশ্রয় নেব, যা আমাকে পানি থেকে বাঁচাবে।" কিন্তু একটি বিশাল ঢেউ এসে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় এবং সে ডুবে মারা যায়।

৫. জুদী পাহাড়ে নৌকার নোঙর

দীর্ঘদিন পানিতে ভাসার পর প্লাবনের পানি কমতে শুরু করে। আল্লাহর নির্দেশে নূহ (আ.)-এর নৌকা বর্তমান তুরস্কের (মতান্তরে আরমেনিয়া সীমান্তের) 'জুদী পাহাড়ে' এসে নোঙর করে। সেখান থেকেই পৃথিবীতে নতুন করে মানববসতি শুরু হয়।


🌍 অন্যান্য ধর্ম ও প্রাচীন সভ্যতায় নূহ (আ.) ও মহাপ্লাবন

আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, একটি বৈশ্বিক মহাপ্লাবনের বর্ণনা কেবল কুরআনে নয়, বরং ইহুদি, খ্রিস্টান, হিন্দু ধর্ম এবং মেসোপটেমীয় সভ্যতাতেও পাওয়া যায়। এর মূল কারণ হলো, ঘটনাটি ঐতিহাসিকভাবে সত্য এবং বিভিন্ন জাতির মুখে মুখে এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রবাহিত হয়েছে।

✝️ ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মে (Judaism & Christianity)

বাইবেলের 'বুক অফ জেনেসিস' (Book of Genesis)-এ হযরত নূহ (আ.)-এর ঘটনা বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে।

  • নাম: সেখানে তাঁকে 'Noah' (নোয়াহ) বলা হয়েছে।
  • ঘটনা: বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, মানুষের পাপ যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন ঈশ্বর পৃথিবী ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নোয়াহকে একটি 'Ark' (নৌকা/সিন্দুক) বানানোর নির্দেশ দেন।
  • পাহাড়: বাইবেল মতে প্লাবনের পর নোয়াহর নৌকা 'আরারাত পর্বত' (Mount Ararat)-এ গিয়ে থামে।
  • রংধনু: বাইবেলে উল্লেখ আছে, প্লাবনের পর ঈশ্বর আকাশে রংধনু (Rainbow) সৃষ্টি করে প্রতিশ্রুতি দেন যে, পানি দিয়ে আর কখনো পৃথিবী ধ্বংস করবেন না।

🕉️ হিন্দু ধর্মে (Hinduism)

হিন্দু পুরান (যেমন: শতপথ ব্রাহ্মণ ও মৎস্য পুরাণ)-এ এক বিশাল জলপ্লাবনের কথা বলা হয়েছে, যা নূহ (আ.)-এর ঘটনার সাথে গভীরভাবে মিলে যায়।

  • চরিত্র: হিন্দু পুরাণে নূহ (আ.)-এর সমতুল্য চরিত্র হলেন 'মনু' (Manu)।
  • ঘটনা: ভগবান বিষ্ণু 'মৎস্য' (মাছ)-এর রূপ ধারণ করে মনুকে এক প্রলয়ংকরী বন্যার বিষয়ে সতর্ক করেন। মৎস্য অবতার মনুকে একটি বিশাল নৌকা তৈরি করতে বলেন এবং সেই নৌকায় সমস্ত জীবের বীজ বা প্রজাতি এবং সপ্তর্ষিদের (সাতজন ঋষি) তুলে নিতে বলেন।
  • পাহাড়: বন্যার পর মনুর নৌকা হিমালয়ের কোনো এক চূড়ায় গিয়ে আটকে যায়। মনুর বংশধররাই পরবর্তীতে মানবজাতি হিসেবে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে।

📜 সুমেরীয় ও মেসোপটেমীয় সভ্যতায় (Mesopotamian Mythology)

সবচেয়ে প্রাচীন লিখিত সাহিত্য 'এপিক অব গিলগামেশ' (Epic of Gilgamesh)-এও হুবহু এই মহাপ্লাবনের বর্ণনা রয়েছে।

  • চরিত্র: এখানে নূহ (আ.)-এর মতো চরিত্রের নাম হলো 'উত্নাপিশতিম' (Utnapishtim) বা কোনো কোনো বর্ণনায় 'আত্রাহাসিস'।
  • ঘটনা: দেবতারা যখন মানবজাতিকে ধ্বংসের জন্য বন্যার সিদ্ধান্ত নেন, তখন এনকি (Enki) নামক দেবতা উত্নাপিশতিমকে একটি বিশাল নৌকা বানানোর বুদ্ধি দেন এবং তার পরিবার ও পশুদের বাঁচাতে বলেন।

💡 ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা

নূহ (আ.)-এর এই ঐতিহাসিক ঘটনা আমাদের জন্য গভীর শিক্ষার ভাণ্ডার:

  • ধৈর্য ও অবিচলতা: ৯৫০ বছর ধরে লাগাতার অবজ্ঞার পরও তিনি আল্লাহর পথে দাওয়াত দেওয়া বন্ধ করেননি। এটি আমাদের চরম ধৈর্যের শিক্ষা দেয়।
  • ঈমান রক্তসম্পর্কের চেয়েও বড়: নিজের ঔরসজাত সন্তান হওয়া সত্ত্বেও নূহ (আ.)-এর ছেলে আল্লাহর আজাব থেকে রক্ষা পায়নি। কারণ আল্লাহর কাছে বংশ বা রক্তের চেয়ে ঈমানের মূল্য বেশি।
  • অহংকারের পতন: প্রযুক্তি বা অহংকার আল্লাহর আজাবের সামনে কিছুই নয়। পাহাড়ের চূড়াও সেদিন অহংকারী ছেলেকে বাঁচাতে পারেনি।

🔚 উপসংহার

হযরত নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনের ঘটনাটি কেবল ইসলাম ধর্মের নয়, বরং এটি মানব ইতিহাসের এক অলঙ্ঘনীয় সত্য, যা বিভিন্ন ধর্ম ও সভ্যতায় নিজ নিজ সংস্কৃতির আবরণে আজও বেঁচে আছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখনই পৃথিবীতে পাপাচার ও স্রষ্টার প্রতি অবাধ্যতা চরমে পৌঁছেছে, তখনই প্রকৃতি তার ভয়াল রূপ ধারণ করেছে। নূহ (আ.)-এর কিস্তি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মুক্তির একমাত্র পথ স্রষ্টার প্রতি অবিচল বিশ্বাস ও আত্মসমর্পণ।