Bangladesh
25 Jan, 2026 • 37 views
আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী: জীবন, রাজনীতি ও অবদানের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস
আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী ছিলেন বাংলাদেশের ইসলামী অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি একাধারে ছিলেন বিশ্বনন্দিত মুফাসসিরে কুরআন, প্রখ্যাত বাগ্মী, রাজনীতিবিদ এবং লেখক। কুরআনের তাফসিরকে তিনি যেমন সাধারণ মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছেন, তেমনি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে ইসলামের পক্ষে কথা বলেছেন। তাঁর জীবন ছিল কর্মমুখর, আন্দোলনমুখর এবং একইসাথে ঘটনাবহুল ও বিতর্কিত।

*(চিত্র: আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী)*
---
## 📌 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও প্রারম্ভিক জীবন
আল্লামা সাঈদী ১৯৪০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাওলানা ইউসুফ সাঈদীও একজন আলেম ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। তিনি দেশের স্বনামধন্য কওমি ও আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ১৯৬২ সালে ছারছীনা আলিয়া মাদরাসা থেকে কামিল পাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা ও পড়াশোনা করেন।
---
## 📖 কুরআনের পাখি: তাফসির ও দাওয়াহ কার্যক্রম
আল্লামা সাঈদী মূলত খ্যাতি অর্জন করেন তাঁর জাদুকরী বক্তৃতার মাধ্যমে। তিনি টানা ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশ-বিদেশে কুরআনের তাফসির করেছেন।
* **সহজ উপস্থাপনা:** তিনি জটিল ধর্মীয় বিষয়গুলোকে সমসাময়িক বিজ্ঞান ও রাজনীতির আলোকে অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় উপস্থাপন করতেন।
* **গণমানুষের আকর্ষণ:** তাঁর মাহফিলে লাখো মানুষের সমাগম হতো। তাঁর কণ্ঠস্বর এবং বাচনভঙ্গি তাঁকে ‘কুরআনের পাখি’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল।
> **“কুরআন শুধু তিলাওয়াতের গ্রন্থ নয়, বরং এটি জীবন পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ সংবিধান।”** — আল্লামা সাঈদী
---
## 🏛️ সংসদে সাঈদী: রাজনৈতিক অধ্যায়
আল্লামা সাঈদী কেবল ওয়াজ মাহফিলে সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তিনি রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণেও ভূমিকা রেখেছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

*(চিত্র: জাতীয় সংসদে বক্তব্যরত অবস্থায় আল্লামা সাঈদী। তিনি পিরোজপুর-১ আসন থেকে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।)*
সংসদ সদস্য থাকাকালে তিনি ইসলামের পক্ষে এবং জনদুর্ভোগ নিরসনে জোরালো বক্তব্য রাখেন, যা তাঁকে একজন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে পরিচিতি দেয়।
---
## ⚖️ ট্রাইব্যুনাল ও বিচারিক বিতর্ক
২০১০ সালের পর থেকে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।

*(চিত্র: ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আল্লামা সাঈদী। দৃঢ় চিত্তে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।)*
২০১৩ সালে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, যা পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডে রূপান্তর করে। এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং দেশীয় রাজনীতিতে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় ওঠে।
---
## 🔥 রাজপথের প্রতিবাদ: কাফনের মিছিল
২০১৩ সালে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর সারা দেশে নজিরবিহীন প্রতিবাদ শুরু হয়। তাঁর ভক্ত ও অনুসারীরা রাজপথে নেমে আসেন।

*(চিত্র: সাঈদীর রায়ের প্রতিবাদে ঐতিহাসিক মিছিল। এই মিছিলে ভক্তরা নিজেদের গায়ে **“সাঈদীকে নয়, আমাকে মার”** স্লোগান লিখে রাস্তায় নেমে আসে। এটি ছিল তাঁর প্রতি সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসার এক চরম বহিঃপ্রকাশ।)*
---
## 🤲 কারাগারে আধ্যাত্মিক জীবন
দীর্ঘ ১৩ বছর তিনি কারাগারে বন্দি ছিলেন। কিন্তু এই বন্দিদশাও তাঁকে মানসিকভাবে দুর্বল করতে পারেনি। কারাগারে তিনি লেখালেখি এবং ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকতেন।

*(চিত্র: কারাগারের প্রকোষ্ঠে জায়নামাজে বসে মহান রবের দরবারে প্রার্থনারত আল্লামা সাঈদী। শত কষ্টের মাঝেও তিনি ছিলেন আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলকারী।)*
---
## 🏥 সমাজসেবা ও অবদান
ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে তিনি বহু সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা এবং চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি আর্তমানবতার সেবা করেছেন।

*(চিত্র: পিরোজপুরে অবস্থিত সাঈদী ফাউন্ডেশন ও মসজিদ। এটি তাঁর সমাজসেবামূলক কাজের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।)*
---
## 🕊️ মহাপ্রস্থান: জানাজায় জনসমুদ্র
২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট, কাশিমপুর কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে শোকের ছায়া নেমে আসে।

*(চিত্র: আল্লামা সাঈদীর জানাজার দৃশ্য। প্রশাসন ও নানা প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে লাখ লাখ মানুষ অশ্রুসজল চোখে তাদের প্রিয় রাহবারকে শেষ বিদায় জানায়।)*
---
## 📝 উপসংহার
আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একটি নাম, যা মুছবার নয়। তাঁকে নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু বাংলা ভাষায় কুরআনের দাওয়াত প্রচারে এবং ইসলামী জাগরণে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া অডিও-ভিডিও লেকচার এবং লেখা বইগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষকে আলোর পথ দেখাবে।