Bangladesh
22 Jan, 2026 • 26 views
সিলেট ভাষা: ইতিহাস, উৎস এবং ভাষাগত বৈশিষ্ট্য
সিলেটি ভাষা (Sylheti) দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী ভাষা। এটি মূলত বাংলাদেশের সিলেট বিভাগ এবং ভারতের আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকা ও ত্রিপুরার কিছু অংশে প্রচলিত। ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ইন্দো-আর্য ভাষা পরিবারের পূর্বাঞ্চলীয় শাখার অন্তর্গত।
অনেকে এটিকে বাংলা ভাষার একটি উপভাষা মনে করলেও, এর ধ্বনিতত্ত্ব (phonology), রূপতত্ত্ব ও শব্দভান্ডার প্রমিত বাংলা থেকে এতটাই আলাদা যে অনেক আধুনিক ভাষাবিদ একে একটি স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে গণ্য করেন।

<br>*চিত্র: সিলেটের মনোরম চা বাগান—এই অঞ্চলের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।*
---
### ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভাষার বিকাশ
**প্রাচীন ভিত্তি ও আর্যীকরণ**
সিলেট অঞ্চলটি প্রাচীনকাল থেকেই অস্ট্রো-এশীয় এবং তিব্বত-বর্মণ জনগোষ্ঠীর প্রভাব বলয়ে ছিল। পরবর্তীতে আর্যদের আগমনের ফলে এই অঞ্চলের ভাষাকাঠামোতে ইন্দো-আর্য বৈশিষ্ট্য যুক্ত হয়। মাগধী প্রাকৃত এবং প্রাচীন বাংলা বা কামরূপী ভাষার পূর্বাঞ্চলীয় রূপ থেকে সিলেটি ভাষার মূল কাঠামোটি তৈরি হয়েছে।
**সুফি প্রভাব ও শব্দভান্ডারের সমৃদ্ধি**
১৩০৩ সালে প্রখ্যাত সুফি সাধক হযরত শাহজালাল (র.) এবং তাঁর ৩৬০ জন আউলিয়ার সিলেট আগমন শুধু ধর্মীয় পরিবর্তনই আনেনি, ভাষার ক্ষেত্রেও বিপ্লব ঘটিয়েছিল। তাঁদের সাথে আসা অনুসারী এবং মুঘল শাসনের প্রভাবে আরবি, ফারসি এবং তুর্কি ভাষার প্রচুর শব্দ সিলেটি ভাষায় মিশে যায়।
* **উদাহরণ:** দোস্ত (বন্ধু), মেহমান (অতিথি), জায়গা (স্থান), বেটাইন/বেটিন (ছেলে/মেয়ে)।
---
### সিলেটি ভাষার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য
প্রমিত বাংলার সাথে সিলেটির সম্পর্ক থাকলেও, এর উচ্চারণ ও গঠনশৈলী সম্পূর্ণ ভিন্ন।
**১. ধ্বনিগত অনন্যতা**
* **'স' এবং 'হ'-এর ব্যবহার:** প্রমিত বাংলার **"শ"**, **"ষ"**, **"স"** ধ্বনিগুলো সিলেটিতে প্রায়শই **"হ"** (H) ধ্বনিতে রূপান্তরিত হয়।
* *বাংলা:* শিশু → *সিলেটি:* **হিহু**
* *বাংলা:* সব → *সিলেটি:* **হব**
* **'ক' ধ্বনির রূপান্তর:** শব্দের শুরুতে থাকা বাংলা **'ক'** ধ্বনিটি সিলেটিতে গলার গভীর থেকে উচ্চারিত 'খ' (Kh) বা আরবি 'Kha'-এর মতো শোনায়।
* *বাংলা:* কাল → *সিলেটি:* **খাইল**
* **'র' ধ্বনির বিলোপ:** শব্দের শেষে বা মাঝে অনেক সময় **'র'** ধ্বনিটি লুপ্ত হয়ে যায়।
* *বাংলা:* ঘর → *সিলেটি:* **ঘ**
**২. ব্যাকরণ ও বাক্যগঠন**
* **ক্রিয়াপদের ভিন্ন রূপ:** প্রমিত বাংলায় "আমি যাচ্ছি", সিলেটিতে "**আমি যাইরাম**"।
* **নেতিবাচক বাক্য:** নেতিবাচক শব্দ 'না' ক্রিয়াপদের শেষে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি। যেমন: "করি না" → "**খরিনা**"।
---
### সিলেটি নাগরী লিপি: এক হারানো গৌরব
সিলেটি ভাষার ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হলো এর নিজস্ব লিপি—**সিলেটি নাগরী**। এটি বাংলা লিপি থেকে আলাদা এবং দেখতে অনেকটা কায়থী লিপির মতো।

<br>*চিত্র: প্রাচীন পুঁথিতে সিলেটি নাগরী লিপির নমুনা। একসময় এই লিপিতেই রচিত হতো সিলেটের লোকসাহিত্য।*
মূলত মুসলিম সুফি-সাধক ও সাধারণ মানুষেরা তাঁদের ধর্মীয় গ্রন্থ ও পুঁথি লেখার জন্য এই লিপি ব্যবহার করতেন। বর্তমানে এই লিপি পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা চলছে।
---
### রাজনৈতিক ইতিহাস ও ১৯৪৭-এর গণভোট
**ব্রিটিশ আমল ও আসামে অন্তর্ভুক্তি**
১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ প্রশাসন মূলত চা-শিল্পের সুবিধার্থে সিলেটকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে 'আসাম প্রদেশ'-এর সাথে যুক্ত করে।
**১৯৪৭ সালের সিলেট গণভোট**
ভারত ভাগের সময় সিলেটের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য ১৯৪৭ সালে একটি ঐতিহাসিক গণভোট হয়। সিলেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পাকিস্তানের (তৎকালীন পূর্ববঙ্গ) পক্ষে রায় দেয়।
* **কারণ:** এই সিদ্ধান্তটি ভাষাগত ছিল না, বরং ছিল **ধর্মীয় ও রাজনৈতিক**। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ আসামের অধীনে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত ছিল। ফলে করিমগঞ্জ বাদে বৃহত্তর সিলেট বাংলাদেশের অংশ হয়।

<br>*চিত্র: সিলেটে হযরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার। সুফি সাধকদের প্রভাব এই অঞ্চলের ভাষায় আজও বিদ্যমান।*
---
### বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় দেড় কোটিরও বেশি মানুষ সিলেটি ভাষায় কথা বলে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে (লন্ডন) বসবাসরত ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের বিশাল অংশের মাতৃভাষা সিলেটি, যা সেখানে একটি শক্তিশালী কমিউনিটি ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।